“হজ্জ মানে আরাফা” — (হাদিস)
হজ্জ ইসলাম ধর্মের পঞ্চম স্তম্ভ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। নিচে দেওয়া হলো পবিত্র হজ্জের পূর্ণ নির্দেশিকা।
হজ্জের পূর্ব প্রস্তুতি
হজ্জে যাওয়ার আগে মানসিক, আর্থিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
- হালাল উপার্জনে হজ্জের খরচ প্রস্তুত করো।
- ঋণ বা দেনা পরিশোধ করে যাও।
- পরিবারের দায়িত্ব সঠিকভাবে নির্ধারণ করে যাও।
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট, টিকা সনদ) প্রস্তুত রাখো।
- হজ্জের নিয়ম, দোয়া ও বিধান আগে থেকে শিখে নাও।
ইহরাম ও নিয়ত
হজ্জের শুরু হয় মিকাত নামক নির্দিষ্ট স্থান থেকে।
সেখানে পৌঁছে ইহরাম পরে হজ্জের নিয়ত করতে হয়।
- পুরুষদের জন্য : দুই টুকরা সাদা অনসেলাই কাপড়।
- নারীদের জন্য: সাধারণ পর্দাসম্মত পোশাক, মুখ ঢাকা নয়।
নিয়ত:
“اللهم لبيك حجا” — “হে আল্লাহ! আমি হাজ্জের নিয়ত করছি।”
এরপর সবাই একসাথে তালবিয়া পাঠ করে:
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”
মক্কায় আগমন ও তাওয়াফুল কুদুম
মক্কায় আগমন ও তাওয়াফুল কুদুম
- কাবা শরিফের চারপাশে ৭ বার তাওয়াফ করা হয়।
- প্রতিবার হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে “আল্লাহু আকবার” বলা।
- এরপর মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাআত নামাজ পড়া হয়।
- এরপর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ (৭ বার হাঁটা) করা হয়।

মিনায় অবস্থান (৮ জিলহজ্জ)
৮ জিলহজ্জে হাজীরা মিনায় যান এবং সেখানে রাত কাটান।
- নামাজ সংক্ষিপ্তভাবে পড়া (যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা, ফজর)।
- দোয়া, কুরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে সময় কাটানো।
- এটি সুন্নত — নবী ﷺ মিনায় অবস্থান করেছিলেন।

আরাফাতের ময়দান (৯ জিলহজ্জ)
হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো আরাফার দিন।
রাসুল ﷺ বলেছেন — “হজ্জ মানে আরাফা।
- সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান ফরজ।
- যোহর ও আসর নামাজ একসাথে আদায় করা হয়।
- সারাদিন দোয়া, কান্নাকাটি, ইস্তেগফার, ও আল্লাহর প্রশংসায় সময় কাটানো।

মুযদালিফা (রাত্রীকালীন অবস্থান ও পাথর সংগ্রহ)
সূর্যাস্তের পর হাজীরা মুযদালিফা যান।
- সেখানে মাগরিব ও ইশা নামাজ একসাথে পড়া হয়।
- খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো সুন্নত।
- এখান থেকে শয়তান মারার জন্য ৭০টি ছোট পাথর সংগ্রহ করা হয়।
- ফজরের পর দোয়া করে মিনার দিকে রওনা হওয়া।
মিনায় ফেরা (১০ জিলহজ্জ – ঈদের দিন)
এই দিনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো সম্পন্ন করা হয়।
- শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ (রমি):
- বড় জামরার দিকে ৭টি ছোট পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
- প্রতিবার “আল্লাহু আকবার” বলা হয়।
- কোরবানি করা:
- তামাত্তু’ বা ক্বিরান হজ্জের হাজীদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব।
- মাথা মুন্ডন বা চুল কাটা:
- পুরুষরা পুরো মাথা মুন্ডন করেন, নারীরা চুলের সামান্য অংশ কাটেন।
- ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়া:
- এই ধাপে অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।
তাওয়াফুল ইফাদা (ফরজ তাওয়াফ)
এটি হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ অংশ।
- কাবা শরিফে ফিরে গিয়ে আবার ৭ বার তাওয়াফ করা হয়।
- এরপর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ করা হয় (যদি আগে না করা হয়)।
- এই কাজের পর হাজী সম্পূর্ণভাবে ইহরামের বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হয়।
তশরীক দিবস (১১–১৩ জিলহজ্জ)
এই তিন দিন হাজীরা আবার মিনায় অবস্থান করেন এবং প্রতিদিন শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন।
- প্রতিদিন ৩টি জামরায় ৭টি করে পাথর (মোট ২১টি) নিক্ষেপ করা হয়।
- রমির পর দোয়া করা হয়।
- ১২ তারিখ পর্যন্ত থাকা ওয়াজিব; ১৩ তারিখ থাকা মুস্তাহাব।
তাওয়াফুল ওদা (বিদায়ী তাওয়াফ)
হজ্জ সম্পন্ন হওয়ার পর মক্কা ত্যাগের আগে হাজীরা কাবা শরিফকে বিদায় জানাতে তাওয়াফুল ওদা করেন।
- এটি ওয়াজিব (হজ্জের শেষ আমল)।
- বিদায়ের সময় আল্লাহর কাছে কবুলের দোয়া করা হয়।

মদিনা জিয়ারাহ (ঐচ্ছিক কিন্তু মহাসওয়াবের কাজ)
হজ্জ শেষে অনেক হাজী মদিনায় গিয়ে নবী করিম ﷺ-এর রওজা শরিফ জিয়ারত করেন।
- মসজিদে নববীতে নামাজ পড়া (এক রাকাত = ১,০০০ রাকাতের সমান সওয়াব)।
- রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজায় সালাম দেওয়া:
“السلام عليك يا رسول الله”
- মসজিদে কুবা ও জন্নাতুল বাকি কবরস্থান পরিদর্শন করা মুস্তাহাব।
হজ্জে যাওয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- নিয়মিত পানি পান করো (বিশেষ করে আরাফা ও মিনায়)।
- গাইড বা দলের নির্দেশ মেনে চলো।
- ভিড়ে ধৈর্য ধরো ও সহযাত্রীদের সাহায্য করো।
- নিয়মিত নামাজ, দোয়া ও তাওবা পড়ো।
- প্রয়োজনীয় জিনিস (ছাতা, স্লিপার, ওষুধ, ব্যাগ) কাছে রাখো।
- স্মার্টফোনে হজ্জের দোয়া ও মানচিত্র অ্যাপ রাখো।
হজ্জ এমন এক ইবাদত যা মানুষকে আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়।
আল্লাহ তায়ালা যেন তোমার হজ্জ কবুল করেন, সব কষ্ট সহজ করে দেন, এবং তোমাকে মাগফিরাতপ্রাপ্ত হাজী হিসেবে ফিরিয়ে আনেন — আামিন।
