Ummah Global Aviation

হজ্জ গাইড

01

“হজ্জ মানে আরাফা” — (হাদিস)

হজ্জ ইসলাম ধর্মের পঞ্চম স্তম্ভ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। নিচে দেওয়া হলো পবিত্র হজ্জের পূর্ণ নির্দেশিকা।

হজ্জের পূর্ব প্রস্তুতি

হজ্জে যাওয়ার আগে মানসিক, আর্থিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

  • হালাল উপার্জনে হজ্জের খরচ প্রস্তুত করো।
  • ঋণ বা দেনা পরিশোধ করে যাও।
  • পরিবারের দায়িত্ব সঠিকভাবে নির্ধারণ করে যাও।
  • প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট, টিকা সনদ) প্রস্তুত রাখো।
  • হজ্জের নিয়ম, দোয়া ও বিধান আগে থেকে শিখে নাও।

ইহরাম ও নিয়ত

হজ্জের শুরু হয় মিকাত নামক নির্দিষ্ট স্থান থেকে।
সেখানে পৌঁছে ইহরাম পরে হজ্জের নিয়ত করতে হয়।

  • পুরুষদের জন্য : দুই টুকরা সাদা অনসেলাই কাপড়।
  • নারীদের জন্য: সাধারণ পর্দাসম্মত পোশাক, মুখ ঢাকা নয়।

নিয়ত:

“اللهم لبيك حجا” — “হে আল্লাহ! আমি হাজ্জের নিয়ত করছি।”

এরপর সবাই একসাথে তালবিয়া পাঠ করে:

“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”

মক্কায় আগমন ও তাওয়াফুল কুদুম

মক্কায় আগমন ও তাওয়াফুল কুদুম

  1. কাবা শরিফের চারপাশে ৭ বার তাওয়াফ করা হয়।
  2. প্রতিবার হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে “আল্লাহু আকবার” বলা।
  3. এরপর মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাআত নামাজ পড়া হয়।
  4. এরপর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ (৭ বার হাঁটা) করা হয়।
mina 2021 07 18 12 12 54

মিনায় অবস্থান (৮ জিলহজ্জ)

৮ জিলহজ্জে হাজীরা মিনায় যান এবং সেখানে রাত কাটান।

  • নামাজ সংক্ষিপ্তভাবে পড়া (যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা, ফজর)।
  • দোয়া, কুরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে সময় কাটানো।
  • এটি সুন্নত — নবী ﷺ মিনায় অবস্থান করেছিলেন।
arafah 20220629103809

আরাফাতের ময়দান (৯ জিলহজ্জ)

হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো আরাফার দিন
রাসুল ﷺ বলেছেন — “হজ্জ মানে আরাফা।

  • সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান ফরজ।
  • যোহর ও আসর নামাজ একসাথে আদায় করা হয়।
  • সারাদিন দোয়া, কান্নাকাটি, ইস্তেগফার, ও আল্লাহর প্রশংসায় সময় কাটানো।
images

মুযদালিফা (রাত্রীকালীন অবস্থান ও পাথর সংগ্রহ)

সূর্যাস্তের পর হাজীরা মুযদালিফা যান।

  • সেখানে মাগরিব ও ইশা নামাজ একসাথে পড়া হয়।
  • খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো সুন্নত।
  • এখান থেকে শয়তান মারার জন্য ৭০টি ছোট পাথর সংগ্রহ করা হয়।
  • ফজরের পর দোয়া করে মিনার দিকে রওনা হওয়া।

মিনায় ফেরা (১০ জিলহজ্জ – ঈদের দিন)

এই দিনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো সম্পন্ন করা হয়।

  • শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ (রমি):
  • বড় জামরার দিকে ৭টি ছোট পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
  • প্রতিবার “আল্লাহু আকবার” বলা হয়।
  • কোরবানি করা:
  • তামাত্তু’ বা ক্বিরান হজ্জের হাজীদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব।
  • মাথা মুন্ডন বা চুল কাটা:
  • পুরুষরা পুরো মাথা মুন্ডন করেন, নারীরা চুলের সামান্য অংশ কাটেন।
  • ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়া:
  • এই ধাপে অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।

তাওয়াফুল ইফাদা (ফরজ তাওয়াফ)

এটি হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ অংশ

  • কাবা শরিফে ফিরে গিয়ে আবার ৭ বার তাওয়াফ করা হয়।
  • এরপর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ করা হয় (যদি আগে না করা হয়)।
  • এই কাজের পর হাজী সম্পূর্ণভাবে ইহরামের বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হয়।

তশরীক দিবস (১১–১৩ জিলহজ্জ)

এই তিন দিন হাজীরা আবার মিনায় অবস্থান করেন এবং প্রতিদিন শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন।

  • প্রতিদিন ৩টি জামরায় ৭টি করে পাথর (মোট ২১টি) নিক্ষেপ করা হয়।
  • রমির পর দোয়া করা হয়।
  • ১২ তারিখ পর্যন্ত থাকা ওয়াজিব; ১৩ তারিখ থাকা মুস্তাহাব।

তাওয়াফুল ওদা (বিদায়ী তাওয়াফ)

হজ্জ সম্পন্ন হওয়ার পর মক্কা ত্যাগের আগে হাজীরা কাবা শরিফকে বিদায় জানাতে তাওয়াফুল ওদা করেন।

  • এটি ওয়াজিব (হজ্জের শেষ আমল)।
  • বিদায়ের সময় আল্লাহর কাছে কবুলের দোয়া করা হয়।
madina 20220702181330

মদিনা জিয়ারাহ (ঐচ্ছিক কিন্তু মহাসওয়াবের কাজ)

হজ্জ শেষে অনেক হাজী মদিনায় গিয়ে নবী করিম ﷺ-এর রওজা শরিফ জিয়ারত করেন।

  • মসজিদে নববীতে নামাজ পড়া (এক রাকাত = ১,০০০ রাকাতের সমান সওয়াব)।
  • রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজায় সালাম দেওয়া:

“السلام عليك يا رسول الله”

  • মসজিদে কুবা ও জন্নাতুল বাকি কবরস্থান পরিদর্শন করা মুস্তাহাব।

হজ্জে যাওয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  1. নিয়মিত পানি পান করো (বিশেষ করে আরাফা ও মিনায়)।
  2. গাইড বা দলের নির্দেশ মেনে চলো।
  3. ভিড়ে ধৈর্য ধরো ও সহযাত্রীদের সাহায্য করো।
  4. নিয়মিত নামাজ, দোয়া ও তাওবা পড়ো।
  5. প্রয়োজনীয় জিনিস (ছাতা, স্লিপার, ওষুধ, ব্যাগ) কাছে রাখো।
  6. স্মার্টফোনে হজ্জের দোয়া ও মানচিত্র অ্যাপ রাখো।

হজ্জ এমন এক ইবাদত যা মানুষকে আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়।
আল্লাহ তায়ালা যেন তোমার হজ্জ কবুল করেন, সব কষ্ট সহজ করে দেন, এবং তোমাকে মাগফিরাতপ্রাপ্ত হাজী হিসেবে ফিরিয়ে আনেন — আামিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *